পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর টাকা তুলেছে টেকনো ড্রাগস লিমিটেড। সেই কোম্পানিই এখন ২০৩ কোটি টাকার ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় গাজীপুরের একটি ওষুধ কারখানা ও জমি নিলামে তুলেছে ব্যাংক। ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে কারখানা হারানোর মুখে পড়া এই ঘটনা দেশের পুঁজিবাজার ও ওষুধ শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোম্পানির পরিচালক আরেফিন রাফি আহমেদ নিজেই স্বীকার করেছেন, সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
কারখানাটি নিলামে বিক্রি হলে টেকনো ড্রাগসের ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রমে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কোম্পানিটির শেয়ারদরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি স্পষ্ট। যাঁরা কোম্পানির ওপর আস্থা রেখে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে আরেফিন রাফি আহমেদ বলেন, এ কারণেই ব্যাংক গাজীপুরের কারখানা ও জমি নিলামে তুলেছে। পরিণতি নিয়েও তিনি লুকোছাপা করেননি। তাঁর ভাষ্য, “এতে আমাদের ওষুধ উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। শেয়ারের দাম কিছুটা কমতে পারে।” অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ নিজেই মানছে, ঋণ শোধ করতে না পারার খেসারত দিতে হবে উৎপাদন ও বিনিয়োগকারী উভয়কেই। শেয়ারের দাম “কিছুটা” কমবে, নাকি বড় ধাক্কা আসবে, তা বলবে বাজারই। তবে কোম্পানির নিজস্ব পরিচালকের মুখে এমন স্বীকারোক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কসংকেত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই ঋণের দায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের। তাঁরা হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান খালেদা আখতার খান এবং পরিচালক মেহরীন আহমেদ, আরেফিন রাফি আহমেদ ও মো. মামুনুর রশিদ। অর্থাৎ কোম্পানির নীতিনির্ধারণের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাই ২০৩ কোটি টাকার এই দায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আরেকটি তথ্য। সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সরবরাহের প্রায় ৯৬ কোটি টাকার একটি দরপত্রে আবেদন করেছে টেকনো ড্রাগস। অথচ যে কোম্পানির প্রধান কারখানাই নিলামে উঠেছে, সেটি কীভাবে সরকারি সরবরাহের মতো বড় দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে সামলাবে, সেই প্রশ্ন এখন জোরালো। একদিকে ঋণ শোধে ব্যর্থতা, অন্যদিকে বড় অঙ্কের সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণ, এই দুইয়ের বৈপরীত্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানা বিক্রি হয়ে গেলে ভবিষ্যতে ওষুধ উৎপাদন ও সরকারি সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
টেকনো ড্রাগস শুধু সাধারণ ওষুধ বানায় না। প্রতিষ্ঠানটি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ, ইনজেকশন, হরমোন এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষায়িত অনকোলজি ওষুধ উৎপাদন করে। এসব ওষুধের সরবরাহে ছেদ পড়লে ভুগতে হতে পারে রোগীদেরই, বিশেষ করে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্তরা, যাঁদের চিকিৎসায় নিয়মিত ওষুধ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঋণখেলাপি কোম্পানির দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক চাপে পড়েছে।
ঋণখেলাপির বাইরেও টেকনো ড্রাগসের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। মুনাফার নির্ধারিত অংশ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করা, আয়কর আইন লঙ্ঘন এবং কোম্পানির শেয়ারকে কেন্দ্র করে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গেও বড় ধরনের বিশ্বাসভঙ্গ। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিলাম ও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব মেলেনি। যে কোম্পানির প্রধান কারখানা নিলামে, বিনিয়োগকারীরা যখন উদ্বিগ্ন, তখন শীর্ষ কর্মকর্তার এই নীরবতা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়াচ্ছে।
২০৩ কোটি টাকার ঋণখেলাপির জেরে কারখানা নিলামে ওঠায় কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা, সরকারি সরবরাহ এবং শেয়ারের দামের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকে এখন নজর বিনিয়োগকারী, রোগী ও সরকারের।